ঘরের রঙে ফুটে উঠুক মনের ভাব-The color of the house is reflected

Published on Home Decor
colorful-drawing-room-interior-design-flag-bangladesh-ltd.jpg

রঙ মানুষকে যেমন প্রফুল্ল করে। তেমনি রঙ মনে বিষাদের সুর সৃষ্টি করে। যেমনটা আমরা প্রকৃতির দিকে তাকালেই টের পাই। প্রকৃতির এত রঙ আমাদের তাই অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতির পাশাপাশি বিষণ্ণতায়ও ডুবিয়ে দেয়। তাহলে বলাই যায় যে, মানুষ মাত্রই রঙের প্রতি দুর্বল। আর এই প্রভাবটা আমাদের নিত্যদিনের জীবনের জন্য আরো বেশি দরকারি। সিমেন্টের এই জঙ্গলে আর যান্ত্রিক জীবনের কোলাহলে সময় কোথায় সকালে উঠে প্রকৃতি দেখার? কিন্তু ঘরটাই যদি সেজে উঠে প্রকৃতির রঙে! অথবা আকাশের বিশালতা হয়তো এক টুকরো ঘরে পাওয়া যাবে না কিন্তু আকাশের রঙটা তো থাকবে আপনার মনের যত্নে। তাই, ঘরের রঙ আপনার মনকে সরাসরি প্রভাব ফেলে থাকে। আর সেজন্যই ঘরের রঙে কি করে ফুটিয়ে তুলবেন নিজের মনের ভাব তাই নিয়ে আজকের আলোচনা সাজানো।

ঘরের রঙের মনস্তত্ব-The color of the house

যদিও আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই ঘরের রঙ নিয়ে খুব বেশি একটা সচেতন নয়; কিন্তু এই ব্যাপারটা আমাদের নিত্যদিনকার জীবনে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ঘরের রঙ কেবল আমাদের মন-মেজাজই নয়; বরং এটি আমাদের চিন্তা-ভাবনা, বয়স, লিঙ্গ, জাতিভেদ, রুচি ইত্যাদি বিষয়কেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে থাকে। আবার, রঙের কারণে ঘরের বেশভূষাই পালটে যেতে পারে। যেমন ঘরে সাদা রঙ করা হয় কেবলই ঘরের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির জন্যে; আবার কালো বা গাঢ় রঙের ঘর অনেক আলো জ্বালানোর পরও তা অন্ধকারই লাগবে। তাই, ঘরের রঙের সঙ্গে মনস্তত্ব ব্যাপারটাও অনেকখানিই জড়িত।

wall-Color-interior-design-flag-bangladesh-ltd.jpg

রঙের ভালো-মন্দ-Color Effect

তবে শুধু রঙের দিকে দৃষ্টি দিলেই হবে না। দৃষ্টি দিতে হবে রঙের উপাদানেও। কেননা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, সারাক্ষণ রঙের সংস্পর্শে কাজে থাকা লোকের ক্যানসারের ঝুঁকি ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। এছাড়া রঙে যেন ছত্রাক না জন্মায় সেজন্য ব্যবহার করা হয় ফরমালডিহাইড যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আর ইপক্সি জাতীয় সারফেকটেন্ট মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। রঙ মানবদেহের উপর কতটুকু প্রভাব বিস্তার করে তার ধারণা পাওয়া যায় এর রঙের গন্ধে। এছাড়াও চেষ্টা করুন রঙের গন্ধ দূর হবার পর ঘরে বসবাস করতে।

ঘরভেদে রঙের বৈচিত্র্য-Variety of colors from house to house

ঘরের দেয়াল কোন রঙের ফুটে উঠবে তা মূলত নির্ভর এবং প্রকাশ করে বাসিন্দার রুচি ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াদির উপর। ঘরভেদে রঙের ভিন্নতা থাকা মনকে চাঙ্গা করার একটি প্রক্রিয়াও বটে। উপরন্তু, রঙের বৈচিত্র্য ব্যবহার একঘেয়েমি ভাবটাকেও দূর করে। সাধারণত ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে তিন দেয়াল সাদা রঙে রাখাটাই ভালো। আর বাকি দেয়ালটা নিজস্ব রুচিবোধ অনুযায়ী। আবার, রঙেরও উষ্ণ ও নরম ভাব আছে।

colorful-living-room-interior-design-flag-bangladesh-ltd.jpg

উষ্ণ রঙ-Warm Color

লাল - সব রঙের মধ্যে লাল রঙই হচ্ছে সবচাইতে তীব্র। একইসঙ্গে চিত্তাকর্ষক ও জমজমাট পরিবেশ তৈরিতে লাল রঙের কোন জুড়ি নেই। ঘরের মধ্যে আলাদা এক ধরনের শক্তি অনুভব করায় লাল রঙ। প্রেম, আবেগ, রাগ এবং শক্তিকেও প্রভাবিত করে। তাই, ঘরের প্রবেশমুখ বা ডাইনিং অথবা লিভিং রুমে লাল রঙ ব্যবহার করাটা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।

কমলা - এই রঙে প্রাণবন্ততার ছোঁয়া আছে। হৈ-হুল্লা বা আড্ডা কিংবা গল্পগুজবের পরিবেশ তৈরিতে কমলা রঙ দারুণ কাজ করে। কর্মোদ্যম ও উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে এই রঙ। আর কার্যশক্তিকে করে আরো উদ্যমী। তাই, ঘরের ব্যায়াম ঘর বা খেলার ঘর কমলা রঙে বেশি মানানসই।

হলুদ - সুখ বা উল্লাসের রঙ। হঠাৎ করে হলুদ রঙা ঘরে ঢুকলে যেন মনে হয় এক টুকরো সূর্য নেমে এসেছে এক চিলতে ঘরে। তাই তেজোদ্বীপ্ত রোদের আনন্দ দেয় হলুদ রঙ। সুখের আদানপ্রদানেও এই রঙের প্রাধাণ্য আছে। লিভিং রুম, ডাইনিং রুম, কিচেন এবং এমনকি চিন্তার সুস্থান বাথরুমেও এমন রঙ ব্যবহার করা যায় অনায়াসেই।

গোলাপি - ভালোবাসার শান্ত রঙ। ভালোবাসা এবং শান্তশিষ্ট ব্যাপার-স্যাপারের সাথে জড়িত। সৃজনশীলতা বাড়ায়। অফিসের ব্রেইন স্টর্মিং এরিয়া, বেডরুম অথবা বাগানের এক দেয়াল এই রঙ ব্যবহারের উপযোগী।

light-color-interior-design-flag-bangladesh-ltd.jpg

শীতল রঙ-Cold Color

সবুজ - প্রকৃতি এবং সবচাইতে শান্ত রঙ। এই রঙের প্রকৃতির ছোঁয়া আছে। যেন একগুচ্ছ প্রকৃতি আছে ঘরের ভেতরেই। পাশাপাশি মনকে শান্ত রাখতেও এই রঙ অত্যন্ত কার্যকর। তাই, মানসিক চাপ কমায় এবং উদ্ভাবনশীলতা বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে ওপেন স্পেসের লিভিং রুম; অনেক ক্ষেত্রে বেডরুমেও এই রঙ ব্যবহার করা হয়। তবে গাঢ় সবুজ না হয়ে হালকা সবুজ হলে ভালো।

নীল - শান্ত অথবা বিষণ্ণতার রঙ। সাহিত্যে নীলকে বেদনার রঙ বলা হয়। কিন্তু সমুদ্র আবার প্রশান্তির কথা বলে আমাদের। সেই হিসেবে বেদনার কথাও ঠিক আর প্রশান্তির ব্যাপারটাও উল্লেখযোগ্য বটে। বিজ্ঞান বলে নীল রঙ রক্তচাপ কমায়। শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতে এই রঙ কার্যকর। বেডরুম, বারান্দা এবং বাথরুমে এমন রঙ দেখা যায়।

বেগুনী - বাস্তব বা আভিজাত্যের প্রতীক। গাঢ় বেগুনী রঙকে পাশ্চাত্যে আভিজাত্যের রঙ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আর হালকা বেগুনী রঙকে ধরা হয় রিল্যাক্সের জন্য। বেডরুম, অফিস বা লিভিং রুমে এমন রঙ খুব একটা কটকটা লাগে না।

warm_color-interior-design-flag-bangladesh-ltd.jpg

নিউট্রল রঙ-Nutrual Color

বাদামী - ঐতিগ্যগত বাদামী রঙ। ঐতিহ্য আর উষ্ণতার মিশেল। বুনিয়াদি সাজসজ্জার সঙ্গে মানানসই। মার্জিত ভাব আর সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। বাদামী রঙ বাড়িঘরের যে কোন রুমেই ব্যবহার করা যায়।

ধূসর - রঙের মধ্যে এক নতুন রঙ। আরাম আর উষ্ণতার পরিচয় বহন করে। একইসঙ্গে অনেককিছুই বুঝায় এই রঙ, শুধু আরাম বা উষ্ণতাই নয়। লাইটের শেড পড়লে ধূসর রঙ এক ধরণের ক্ল্যাসিক ও নিরন্তর ভাব ফুটিয়ে তোলে দেয়ালে। আর ধূসর রঙে সূক্ষ্ম আর আধুনিক একটা ভাব আছে।

সাদা - নিরবধি এক ক্ল্যাসিক রঙ। আভিজাত্য আর শান্ত ভাবের জন্য এই রঙের জনপ্রিয়তা আছে। আবার কমন রঙের মধ্যেও পড়ে এটি। ঘরকে আরো বেশি প্রশস্ত এবং খোলামেলা করে তোলে। সাদার ব্যবহার খুব বেশি দেখা যায় মোটামুটি বেশিরভাগ বসতবাড়ির প্রেক্ষাপটেই।

blue-lights-color-interior-design-flag-bangladesh-ltd.jpg

প্রচলিত রঙের খবরাখবর-Traditional color news

বর্তমানে দেশে পরিবেশবান্ধব রঙের দেখা মেলে। এর মধ্যে - ডিসটেম্পার, ইলিউশন এবং প্লাস্টিক পেইন্ট তিনটিই আছে। এগুলো পরিবেশবান্ধব হলেও রঙের ঘ্রাণ না শুকানো অবধি বসবাস করা উচিত নয়। পাশাপাশি রঙের বিষক্রিয়া দূর করতে ইনডোর প্ল্যান্টের ব্যবহারও বেশ জনপ্রিয়। আমাদের দেশে মূলত দুই ধরণের রঙের দেখা মিলে। ওয়াটার বেজড ও অয়েল বেজড। ওয়াটার বেজড রঙের সাধারণত সিসার ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু অয়েল বেজড রঙে সামাণ্য পরিমাণ হলেও সিসা ব্যবহার করা হয়। আর সিসা অবশ্যই ক্ষতিকর।

red_oxide-color-interior-design-flag-bangladesh-ltd.jpg

এছাড়াও, রঙ করার আগে শেড ও টিন্ট সম্পর্কে জেনে নিতে হবে আপনার। খুব সহজ ভাষায় বললে, মৌলিক রঙ সাদা বা সফেদ রঙের দিকে পরিবর্তন করে ফেলাই হলো টিন্ট। আর শেড হলো ঠিক এর উলটো। মৌলিক রঙ কালো রঙের দিকে পরিবর্তন করে ফেলাই হলো শেড। যেমন লাল আর কালোর মিশ্রণে এক নতুন শেড রঙ পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় মেরুন। তাই, পুরো ঘর সাদা করলে যেমন একঘেয়েমি কাজ করবে, তেমনি পুরো ঘর কালো বা গাঢ় রঙের হলে তাতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ব্যাপারটাই বেশি প্রকাশ পাবে। তাই রঙের আগে শেড আর টিন্ট ব্যাপারটা জানা থাকলে এবং কোন ঘরে কোন রঙ বেশি মানানসই - এগুলো জানা থাকলে ঘরের রঙে যেমন বৈচিত্র্যতা আসবে, তেমনই ঘর দৃশ্যত অনেকটাই আরামদায়ক লাগবে।