বৃদ্ধদের জন্য উপযোগী বাড়ির সাতকাহন-Suitable house for the elderly

Published on Home Decor
old-home-flag-bangladesh.jpg

"এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে চলে যেতে হবে আমাদের।" প্রবহমানতায় যেন জীবনের ধর্ম। নিরবধি ছুটে চলা সময়ের বিবর্তনে আজকের শিশু পরিণত হয় আগামীর বৃদ্ধে। শৈশব,কৈশোর,যৌবন পেরিয়ে আসে সে ক্রান্তিলগ্ন। বার্ধক্য। তিলতিল করে গড়ে তোলা সুখের সংসারে বোঝা হিসেবে পরিগণিত হয় এক সময়কার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি। অবশেষে ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে। কিংবা একাকীত্বের বেড়াজালে ধুঁকে ধুঁকে ভুগতে থাকে।

বৃদ্ধ বয়সে শরীরের সবটুকু শক্তি হারিয়ে একজন ব্যক্তির তো খুব বেশি কিছু চাওয়ার থাকে না। সে তো শুধু সম্মানের সাথে নিজ পরিবারের সাথে মিলেমিশে থাকতে চায়। তিলতিল করে গড়ে তোলা সুখের নিবাসে আমৃত্যু থাকতে চাওয়ার বাসনা কি খুব বেশি কিছু? একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলেই তাদের এ ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব। নিজ বাসা-বাড়িতে বৃদ্ধদের জন্য উপযুক্ত কাঠামোগত পরিবর্তন আর তাদের প্রতি সহিষ্ণুতা-সহযোগিতার পরিবেশ তৈরির মাধ্যমেই তাদের এ ছোট্ট ইচ্ছাটি পূরণ করা সম্ভব।

ভবনের সাধারণ কাঠামোগত পরিবর্তন-General structural changes in the building

সারাজীবন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রক্ত পানি করা পরিশ্রমে মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে বানানো একটি বাড়ি হয়ে উঠতে পারে কোনো ব্যক্তির আশা ভরসার শেষ স্থল। ভরসার সেই সম্বলখানিকে আঁকড়ে ধরে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে চাওয়ার ইচ্ছা নিতান্তই অমূলক নয়। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় বার্ধক্য। কর্মক্ষম সময়ে বানানো সেসব অবকাঠামোই যেন প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় বার্ধক্যে। আর তাইতো কষ্টে বানানো সেই বাড়িতে কাঠামোগত সংস্কার কিংবা শুরু থেকেই বার্ধক্যকে মাথায় রেখে বাড়ির কাঠামোগুলো তৈরি করলে আর সেসব বাধার সম্মুখীন হতে হয় না।

  • বৃদ্ধদের জন্য সুবিধাজনক ভবন নির্মাণের জন্য শুরুতেই তাদের চাহিদার কথা মাথায় রাখতে হবে। অর্থাৎ বৃদ্ধ ব্যক্তি কি বাড়িতে একাই থাকবেন নাকি পরিবারের আরো সদস্যদের সাথে বসবাস করবেন - সে বিষয়টি মাথায় রেখে পরবর্তীতে সামনে এগোতে হবে। বৃদ্ধ ব্যক্তি একাই বসবাস করলে তার কাজকর্মের স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রতি প্রাধান্য দিতে হবে।

  • ঘরে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফাঁকা জায়গা রেখে বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা সাজাতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে বৃদ্ধ ব্যক্তি যদি হুইল চেয়ার ব্যবহার করেন তবে তার জন্য সুবিধাজনক হবে এরকম পরিবেশ।

sitting-area-flag-bangladesh.jpg

  • ঘরের মেঝে তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। টাইলসের তৈরি মেঝে পিচ্ছিলতা তৈরি করে অনেক সময় নানা দূর্ঘটনা ঘটাতে পারে। আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর কোনো না কোনো ভাবে পড়ে গিয়ে ৩২০০০ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়। তাই মেঝে তৈরির ক্ষেত্রে একটু সাবধানতাই অনেক বড় ক্ষতির হাত থেকে আমাদের বৃদ্ধদের রক্ষা করতে পারে। মেঝে তৈরির সময় অপিচ্ছিল রেখে কিংবা পরবর্তীতে মেঝেতে অপিচ্ছিল মাদুর ব্যবহার করেও এমন দূর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

  • ঘরের দরজা তৈরির ক্ষেত্রেও বৃদ্ধদের কথা মাথায় রাখতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রশস্ততা রেখে দরজাগুলো তৈরি করতে হবে। বৃদ্ধদের হুইল চেয়ার সহ আরও আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় জিনিস যাতে সহজে পারাপার করা যায় সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। পকেট দরজার মাধ্যমে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কক্ষের সাথে বৃদ্ধদের ঘরের সংযোগ রক্ষা করাও যেতে পারে। এক্ষেত্রে কোনো দৈব দূর্ঘটনা ঘটলে সহজেই তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। দরজার গোলাকার হাতলের চেয়ে খাড়া লিভারের মতো হাতলগুলো বৃদ্ধদের জন্য বেশি সুবিধাজনক। কেননা দরজা খোলা কিংবা বন্ধ করার ক্ষেত্রে গোলাকার হাতলগুলো বেশ কিছুক্ষণ ঘুরাতে হয়। আর আর্থ্রাইটিস বা বাত ব্যথার রোগী বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে একাজটিই অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

door-flag-bangladesh.jpg

  • বৃদ্ধদের জন্য সাধারণত বিল্ডিংয়ের নিচ তলায় বসবাস করা সুবিধাজনক। কেননা এক্ষেত্রে খুব একটা নড়াচড়ার প্রয়োজন হয় না। আর এটি সম্ভব না হলে বৃদ্ধদের জন্য ইলেক্ট্রনিক সিঁড়ি কিংবা লিফটের ব্যবস্থা করা জরুরি। সাথে সিঁড়িতে হাতে ধরে ওঠার জন্য উপযুক্ত রেলিং লাগানোর ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।

  • ঘরে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধদের দৃষ্টিশক্তিও কমতে থাকে। তাই দৃষ্টিস্বল্পতা হেতু পড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে নানা দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। আর তাই পরিকল্পনা করে ঘরে পর্যাপ্ত আলো প্রবেশের কিংবা কৃত্রিমভাবে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা জরুরি।

  • বৃদ্ধ বয়সে সুষম ঘুম কিংবা বিশ্রামের দরকার। আর এজন্য ব্যক্তির বিছানাটি হওয়া উচিত যথেষ্ট আরামদায়ক। ঘরের একটি সুবিধাজনক স্থান বিছানার জন্য নির্ধারণ করা দরকার যাতে করে ব্যক্তি সহজেই বিছানার চারপাশে হাতের নাগালে দরকারি সবকিছু পেতে পারে।

  • বৃদ্ধদের জন্য নির্দিষ্ট ঘরে নিরবচ্ছিন্ন টেলিফোন সংযোগ কিংবা মোবাইল ফোন রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে কোনো দূর্ঘটনায় তাদের সহজেই সহযোগিতা পাওয়া সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে।

bed-room-flag-bangladesh.jpg

বাথরুমের বিন্যাস-Bathroom Layout

বৃদ্ধ বয়সে ব্যক্তির সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রসাব-পায়খানায় অসুবিধার সম্মুখীন হওয়া। এক্ষেত্রে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন মাথায় রাখলে বিষয়টা অনেকাংশেই সহজ হয়ে যায়।

  • একটু আগেই দেখেছি যে বৃদ্ধ বয়সে ভারসাম্যহীনতার কারণে পড়ে যাওয়া অনেক বড় একটা সমস্যা। বাথরুমেও এর ব্যতিক্রম নয়। আর তাই বাথরুমে অপিচ্ছিল মাদুর ব্যবহার করলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। আর টাইলসের মেঝে অনেক ঠাণ্ডা হয়। এটি ব্যবহারে এ ঠাণ্ডার হাত থেকেও বৃদ্ধদের রক্ষা করা সম্ভব হয়।
  • বৃদ্ধদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভালোমতো বসতে না পারা সহ নানা সমস্যা দেখা যায়। এক্ষেত্রে তাদের কথা মাথায় রেখে বাথরুমে স্বাচ্ছন্দে ব্যবহার করা যায় এমন উচ্চতার ও আকারের কমোড ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • বাথরুমে বাথটাব ব্যবহার না করে বরং নাড়াচাড়া করে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায় এমন ঝর্ণাগুলোর ব্যবহার বৃদ্ধদের জন্য অনেক উপকারী হয়। কারণ এতে পিছলে পড়ে যাওয়ার তেমন ভয়ও থাকে না আর স্বাচ্ছন্দে গোসল করা যায়।
  • বাথরুমের সাবান, টিস্যু,পানি সহ যাবতীয় জিনিস যাতে সহজে বৃদ্ধদের হাতের নাগালে পাওয়া যায় এমন ব্যবস্থা করতে হবে।
  • অনেক সময় দেখা যায় অনেকের হুইল চেয়ারে করে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে বাথরুমে সহজে যাতে হুইলচেয়ার পরিবহন করা যায় এমন করে বাথরুমের কাঠামো ডিজাইন করতে হবে।

wash-room-flag-bangladesh.jpg

বিষয়গুলো অনেকটা সাদামাটা শুনালেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এমন কয়েকটি পরিবর্তন বৃদ্ধদের জন্য অনেক উপকারী হয়ে দাঁড়াতে পারে। জীবন রক্ষা পেতে পারে অনেকের। স্বাচ্ছন্দে জীবনটাকে উপভোগ করতে পারেন তারা।

রান্নাঘরের বিন্যাস-Kitchen Layout

সচরাচর একা একাই থাকেন এমন বৃদ্ধদের জন্য রান্নাঘরে নিয়মিত যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। আর এতে দূর্ঘটনাও ঘটে প্রচুর। তাই রান্নাঘরেও কিছু পরিবর্তন তাদের উপকারে আসতে পারে।

  • রান্নাঘরের মেঝেও ভবনের অন্যান্য স্থানের মতো অপিচ্ছিল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • রান্নাঘরের কেবিনেটগুলোতে ড্রয়ার সিস্টেম কিংবা টান দিলেই খুলে যায় এমন কেবিনেটে রান্নার প্রয়োজনীয় বস্তু রাখা সুবিধাজনক। এতে সহজেই দ্রব্যাদি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়।
  • রান্নাঘরে চুলার অবস্থান নির্ধারণে সতর্ক থাকতে হবে। অতিরিক্ত ধোঁয়া প্রতিরোধে চিমনি ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ইলেক্ট্রিক চুলাও ব্যবহার করা যেতে পারে। অগ্নিনির্বাপনের যাবতীয় ব্যবস্থা হাতের নাগালে রাখলে দূর্ঘটনা পরবর্তী অনেক উপকার পাওয়া যায়।

kitchen-flag-bangladesh.jpg

সহযোগিতা-সহমর্মিতার পরিবেশ-An environment of cooperation and compassion

বাড়িতে শুধুমাত্র কাঠামোগত পরিবর্তন আনলেই বৃদ্ধদের থাকার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়ে যায় না। এত এত সব পরিবর্তনের মাঝে বৃদ্ধ ব্যক্তি নিজেকে যেন বৃদ্ধাশ্রমের ন্যায় ধরাবাধা পরিবেশে নিজেকে বন্দি না মনে করেন সে বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। তিনি যে আর দশটা স্বাভাবিক পরিবেশের ন্যায় পরিবেশেই রয়েছেন সে বিষয়টি তার কাছে তুলে ধরা দরকার। তার যে নিজস্ব একটা গুরুত্ব সকলের কাছে রয়েছে এ ব্যাপারটি পরিবারের সকলের আচার আচরণে ফুটে তোলা আবশ্যক। বৃদ্ধ ব্যক্তিকে তার নিজস্ব সুবিধা অসুবিধা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। পরিবারের অনান্য সদস্যদের সাথে তিনি যেন সহজেই মিশে যেতে পারেন এমনই হওয়া উচিত। তাহলেই বৃদ্ধদের জন্য সুন্দর একটি আবাস তৈরির উদ্দেশ্য সফল হবে বলে আশা করা যায়।