রমজানের দিন গুলোতে ইউরোপ-Europe on the days of Ramadan

Published on Ramadan Special
blog-ireland-flag-bangladesh.jpg

আয়ারল্যান্ড। উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের কোল ঘেঁষে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে গড়ে ওঠা একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। আয়তনের দিক দিয়ে ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম দ্বীপ এটি। দৃষ্টিনন্দন পাহাড়, নদী, সাগরে ঘেরা প্রকৃতির এক অনন্য লীলাভূমি যেন এই আয়ারল্যান্ড। দীর্ঘদিন ব্রিটিশ উপনিবেশে থাকার পর স্বাধীনতার পরে আইরিশ রিপাবলিক নামেই পরিচিতি লাভ করে দেশটি।

এখানকার বেশিরভাগ মানুষই ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। তাইতো আর দশটা মুসলিম রাষ্ট্রের ন্যায় রমজানে রোজা পালনের তেমন কোনো ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি এ দেশে। তবে ধীরে ধীরে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানেও জনগণের মাঝে সিয়াম পালনে যথেষ্ট ভাব গাম্ভীর্য লক্ষ করা যায়।

ইসলামি ক্যালেন্ডারের নবম মাস এ রমজান মাস। পুরো রমজান মাস জুড়েই সিয়াম পালনে এক উৎসব মুখর পরিবেশ লক্ষ করা যায় দেশটির ইসলামিক সেন্টারগুলোতে। সব মিলিয়ে দেশটিতে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা মুসলিম সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে যেন রমজানের এই দিনগুলোতে।

শুরুর আগে-before the start

২০১৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যা ৬৫ লাখ ৭২ হাজার ৭২৮ জন। এর মধ্যে মাত্র ১.৩৩ শতাংশ লোক মুসলিম ধর্মাবলম্বী। তবে আয়ারল্যান্ডে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম গুলোর একটি হলো ইসলাম। এখানে ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩০ গুণ। তবে এখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যক হলেন অভিবাসী মুসলিম।

অতীতে আফ্রিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে মুসলমানদের আগমন ঘটে এখানে। শিক্ষা কিংবা জীবিকার টানে তারা ছুটে আসেন আয়ারল্যান্ডে। আগত মুসলিমদের মধ্যে কেউ কেউ আবার আইরিশ মেয়েদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়া,সাব সাহারান আফ্রিকা কিংবা বলকান এলাকা থেকে অনেক মুসলিম পাড়ি জমান এদেশে।

তবে বর্তমানে নওমুসলিমদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলেছে এখানে। একদিকে মোট জনসংখ্যার অতি অল্প সংখ্যক মুসলিম, তারপর আবার এখানে বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের সংমিশ্রণ ঘটায় রমজান মাসকে ঘিরে একেবারে সুনির্দিষ্ট কোনো সংস্কৃতি এখানে গড়ে ওঠেনি। তবে বিভিন্ন দেশের অভিবাসী মুসলমানদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একত্রে সিয়াম পালনের দৃষ্টান্ত এক অনন্য মাত্রা প্রদান করেছে আয়ারল্যান্ডের মুসলিম সংস্কৃতিতে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের অনন্য এক কৃষ্টি।

রমজানের দিনগুলোতে-Ramadan Days

আয়ারল্যান্ডের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সিংহভাগেরই অবস্থান দেশটির সর্ববৃহৎ শহর ডাবলিনে। ডাবলিন আবার আয়ারল্যান্ডের রাজধানীও বটে। স্বাভাবিক ভাবেই দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগের অবস্থানও এই ডাবলিনেই। ১৯৫৯ সালে এই ডাবলিনেই 'ডাবলিন ইসলামিক সোসাইটি' নামে গড়ে ওঠে আয়ারল্যান্ডের প্রথম ইসলামিক সেন্টার। পরবর্তীতে যা ইসলামিক ফাউন্ডেশন অব আয়ারল্যান্ড নামেই পরিচিতি লাভ করে।

পরবর্তীতে ধীরে ধীরে দেশটিতে ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ড, ইসলামিক কালচারাল সেন্টার অব আয়ারল্যান্ড সহ বিভিন্ন ইসলামিক সেন্টার গড়ে ওঠে। দেশটিতে ইসলামের প্রচার প্রসারে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এ ইসলামিক সেন্টারগুলো। রমজানের সময়ে রোজায় সেহরি ও ইফতারের সময়-সূচী জানানো থেকে শুরু করে পুরো রমজান মাস জুড়েই আয়োজন করে নান্দনিক সব ইসলামি আয়োজন। তারই অংশ হিসেবে মসজিদ আর ইসলামিক সেন্টার গুলোতে আয়োজন করা হয় আরবি ভাষা শিক্ষা আর ধর্মীয় আলোচনার আয়োজন। এছাড়া কুরআন শিক্ষা সহ কুরআন তিলাওয়াত বিষয়ক নানা ধরনের প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয় এখানে।

পৃথিবীর যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে রোজা রাখতে হয় তাদের মধ্যে অন্যতম একটি হলো আয়ারল্যান্ড। এ বছর সেখানে সেহরির শেষ সময় প্রায় ভোর ৪ টা আর ইফতারের সময় প্রায় সন্ধ্যা ৭ টা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ১৫ ঘণ্টার মতো রোজা থাকতে হবে এ বছর এখানে। তবে আয়ারল্যান্ডে কোনো কোনো বছর রমজানে ১৯- ২০ ঘণ্টার মতোও রোজা রাখতে হয়।

মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতে রমজানের সময়ে অফিস, আদালতের সময় সূচীতে অনেকটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, কর্মঘণ্টা কমে দেওয়া হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত আকারে চালু রাখা হয় কিংবা বন্ধ রাখা হয়। এক কথায় এক ধরনের ধীরতা লক্ষ করা যায় এ সময় চারপাশের ব্যস্ত পরিবেশে। কিন্তু আয়ারল্যান্ডে এর ব্যতিক্রম। অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব কিছুই চলে আগের মতোই। তাই মুসলিম রোজাদারদের জন্য কর্ম ব্যস্ততার পাশাপাশি সাওম পালন করা এক চ্যালেঞ্জের বিষয় এখানে। তবে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা ঠিকই শত বাধাকে উপেক্ষা করে মাসব্যাপী রোজা রাখে, ইবাদত বন্দেগী করে।

এখানে সেহরিতে আইরিশ খাবারগুলোর পাশাপাশি ব্যক্তি স্বাতন্ত্র অনুযায়ী প্রাধান্য পায় আরবীয়,জার্মান কিংবা নাইজেরীয় খাবার। এছাড়া মুসলিম কমিউনিটিগুলোতে বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা একত্রে বিভিন্ন খাবারের পসরা নিয়ে বাজারের আয়োজন করে। সেখান থেকেও পছন্দ মতো সেহরি ও ইফতারের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার সহ অন্যান্য দ্রব্যাদিও পাওয়া যায় সুলভে।

উন্মুক্ত ইফতার-Open Iftar

আয়ারল্যান্ডের রমজানের সংস্কৃতিতে অনন্য একটি উদ্যোগ হচ্ছে এই উন্মুক্ত ইফতারের আয়োজন। দেশটির বিভিন্ন ইসলামিক সেন্টারগুলোতে ও মসজিদে আয়োজন করা হয় এমন সবার জন্য উন্মুক্ত ইফতারির আয়োজন। মুসলমানদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদেরও দাওয়াত দেওয়া হয় এই আয়োজনে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের সাথে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রক্ষার এ এক অনন্য নজির স্থাপন হয় যেন আন্তর্জাতিক এই ইফতার আয়োজনে। এছাড়া প্রতিবেশী বিধর্মী ভাই-বোনদের ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেওয়াও এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।

রাজধানী ডাবলিন, কর্কের ইসলামিক সেন্টারসহ বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন করা হয় এমন মিলন মেলার। উন্মুক্ত এই ইফতার আয়োজনে আইরিশ খাবার সহ জার্মান, আরবীয়,নাইজেরীয় ইফতারির ব্যবস্থাও থাকে। বাহারি সব খাবারের পসরা দেখে কেউ একে আন্তর্জাতিক ফুড ফেস্টিভাল ভেবে বসলেও ভুল হবে না খুব একটা।

blog-ireland-flag-bangladesh-iftar.jpg

কমিউনিটির লোকেদের পছন্দ অনুযায়ী পরিবেশন করা হয় জলফ ভাত (সরু চালের ভাত,টমেটো,পিঁয়াজ,সবজি ও মাংসের সমন্বয়ে বানানো এক ধরনের পশ্চিম আফ্রিকান খাবার),ডাল,বেগুন ভাজা,চিকেন স্টিউ(মুরগির মাংস,আলু,মিষ্টি আলু,পিঁয়াজ প্রভৃতির সমন্বয়ে তরলে রান্না করা এক ধরনের খাবার),ল্যাম্ব ট্যাজিন(ভেড়ার মাংসের তৈরি উত্তর আফ্রিকান এক ধরনের খাবার)। বিভিন্ন দেশ থেকে আয়ারল্যান্ডে পড়তে আসা শিক্ষার্থী,চাকুরিজীবীসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষের এক অনন্য মিলন মেলায় পরিণত হয় বাহারি এ ইফতার আয়োজন।

তবে করোনার প্রাদুর্ভাবের জন্য গত বছর রমজান মাসে এমন আয়োজন থেকে বঞ্চিত হয়েছিল আয়ারল্যান্ডবাসী। উপেক্ষিত ছিল ভ্রাতৃত্বের মিলন মেলা। মসজিদে-মসজিদে আর ইসলামিক সেন্টারগুলোতে বিরাজ করছিল নির্জন শূন্যতা। ধীরে ধীরে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় মসজিদ আর ইসলামিক সেন্টারগুলো আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেতে শুরু করেছে। রমজান মাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ মিলন মেলা আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

তারাবির নামাজের পরে বিশেষ আলোচনা-After Tarabi

সন্ধ্যার উন্মুক্ত ইফতারে মিলিত হয়ে কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর দিনভর রোজা আর ইবাদতের ক্লান্তি যেন নিমিষেই শেষ হয়ে যায় রোজাদারদের। এরপর মসজিদে মসজিদে শুরু হয় তারাবির সালাতের প্রস্তুতি। কোনো কোনো ইসলামিক সেন্টারে তারাবির নামাজের পরেও চলে রাত জেগে ইবাদত। ইমাম সাহেব দীর্ঘক্ষণ ধরে ধর্মীয় আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে আলোচ্য বিষয়ের উপর প্রশ্নোত্তর পর্বের আয়োজন করা হয়। প্রতিযোগিতার আকারে সঠিক উত্তরদাতাকে ২০০ ইউরো পর্যন্ত পুরস্কৃত করা হয়। এভাবে গভীর রাত পর্যন্ত চলে আয়োজন।

blog-ireland-flag-bangladesh-namaz.jpg

সব মিলিয়ে আয়ারল্যান্ডের মতো একটি ইসলাম অপ্রধান রাষ্ট্রে রমজান মাসে মুসলিম ঐতিহ্যকে ধরে রেখে এভাবেই গড়ে উঠছে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের এক অনন্য নজির। রমজানের ত্যাগ ও সংযমের মহিমায় জীবন গড়তে আগ্রহী হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।