সিলেটি বাড়ির সম্পর্কে অজানা তথ্য জেনে নিন!-Houses of Sylhet

Published on Type of House
house-flag-bangladesh.jfif

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত সিলেট, বাংলাদেশের অন্যতম বিভাগীয় শহর এবং পুণ্যভূমি। বাংলাদেশের লন্ডন হিসেবে পরিচিত সিলেটে আছে অসংখ্য রাজকীয় বাড়ি। এমনকি একটি এরিয়াই আছে যেখানে সব বাড়িগুলো ডুপ্লেক্স হিসেবে নির্মিত হয়েছে। বহু ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনন্য জনপদ সিলেটের বাড়ি ঘরের গঠন ও ডিজাইন সম্পর্কে আজকের এই ফিচার।

সিলেটি বাড়ির প্রকারভেদ-Different type of houses

সিলেটের বিভিন্ন স্থানে সন্ধান মিলবে বিভিন্ন গঠন এবং ডিজাইনের বাড়ি।

আসাম স্টাইলের বাড়ি-Aasami House

সিলেটের ঠিক পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের আসাম, যা সিলেটের পূর্বে অবস্থিত। বহুকাল আগে সিলেট অঞ্চল আসামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে একই সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে এ দুই জনপদের মানুষ বেড়ে উঠেছিল।

ইঙ্গ-বর্মা যুদ্ধে জয়লাভের পর ১৮২৬ সালে ইংরেজরা আসামে প্রশাসনিক অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়। তখন মোগলদের উদ্ভাবিত প্রাসাদ স্থাপত্যের বিপরীতে ইংরেজরা আসামের প্রকৃতি, পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুসারে একটি নতুন স্থাপত্যধারা তৈরি করে। এসব স্থাপত্যই পরে ‘আসাম টাইপ হাউস’ হিসেবে পরিচিতি পায়. সিলেট অঞ্চলের আসাম-আদলের বাড়িগুলোতে যেন ঐতিহ্যিক পরম্পরা

asam-style-house-flag-bangladesh.webp

ঐতিহ্যবাহী আসাম স্টাইলের বাড়িগুলো সিলেট ও আসাম অঞ্চলের স্থানীয় স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন। ১৮৯৭ সালে সিলেট অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর অনেক প্রাসাদ বিধ্বস্ত হলেও আসাম আদলের বাড়িগুলো খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এরপর থেকেই সিলেট অঞ্চলে এই স্টাইলের বাড়ি নির্মাণ ক্রমে বাড়তে শুরু করে। এখনো সিলেট অঞ্চলের অনেক মানুষ এমন ধরনের ঘর নির্মাণ করে থাকেন।

গবেষকদের তথ্যমতে, ১৯২০-১৯৬০ সালের মধ্যে সিলেটে আসাম স্টাইলের বাড়ি সবচেয়ে বেশি নির্মিত হয়েছে।বাড়িগুলো দেখতে ডাকদাবাংলোর মত। যা নির্মাণে বাঁশ কিংবা কাঠের লম্বা আকৃতির দণ্ড বা ব্যাটন ব্যবহার করা হতো। তাই এসব বাড়ি ‘বাংলা ব্যাটন স্টাইল’ নামেও পরিচিতি অর্জন করে।

এসব বাড়ি নির্মাণে কাঠ, বাঁশ বেত, স্টিল এবং কংক্রিট উপকরণে এসব বাড়ি তৈরি করা হয়। ভূমিকম্প সহনীয় ও নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশের নির্মাণশৈলীতে অন্যান্য এসব বাড়ি দেখতে যেমন নয়নাভিরাম বসবাসের জন্যও ছিলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনীয় এবং আরামদায়ক।

An-example-of-Bangla-Baton-house-in-Sylhet-city-Elevation-of-Rafiqul-Haque-Residence-flag-bangladesh.png

তবে সময়ের সাথে সাথে টিন, ত্রিকোণাকৃতির লোহার বার আর চুন সুরকি ব্যবহার করা হয়। পরবর্তীতে ইট, পাথর, বালু ও সিমেন্টের ব্যবহার শুরু হয়। উঁচু কিংবা সমতল যেকোনো স্থানেই এই বাড়ি নির্মাণ করা যায়। সাধারণত এল বা সি লে আউটের হয়।

উঁচু স্থানে সাধারণত আয়তক্ষেত্রাকার হয়। ভারি বৃষ্টিপাত কাটিয়ে উঠার জন্য চৌচালা ছাদ তৈরি করা হয়। দেয়াল কাঠের কাঠামো দিয়ে তৈরি যা সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার করা হয়। বায়ু চলাচলের জন্য কাঠের খিলান ও ভেন্টিলেটর তৈরি করা হয়। বর্তমানে আসাম স্টাইলের ডুপ্লেক্স বাড়িও নির্মাণ হতে দেখা যায়।

কিছু উল্লেখযোগ্য আসাম স্টাইলের বাড়ি হচ্ছে-

  • ডিসি অফিস সংলগ্ন জেলা রেজিস্ট্রার ভবন,
  • সিলেট সুরমা নদীর পাড়ে পুরাতন সার্কিট হাউজ,
  • এম এজি ওসমানীর বাসভবন,
  • জিন্দাবাজারের রেডক্রিসেন্ট,
  • মাতৃমঙ্গল,
  • দরগাহ মহল্লার মোতাওয়াল্লি বাড়ি,
  • মুফতি বাড়ি,
  • পাক্কা বাড়ি,
  • রশিদ মঞ্জিল,
  • কুয়ারপাড় সাধুবাবুর বাড়ি
  • বিমানবন্দর সড়কের মজুমদারবাড়ি,
  • নয়াসড়ক নওরেজিয়ান খৃষ্টান মিশন,
  • সুবিদবাজার দস্তিদার বাড়ি,
  • এমসি কলেজের হোস্টেল এবং বাংলা বিভাগের ভবন,
  • সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলের ভবন।

এছাড়াও কুমারপাড়া, পীর মহল্লা, নয়াসড়ক, দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ উপজেলার রণকেলি, ভাদেশ্বর, ফুলবাড়ি ও ঢাকা দক্ষিণে এখনও কিছু বাড়ি রয়েছে।

ভ্যালি সিটি-Valley city

সিলেটের কোলে সবুজে ঘেরা একটি আবাসন প্রকল্প হচ্ছে ভ্যালি সিটি। এটি একটি এক্সক্লুসিভ হাউজিং সোসাইটি যার কাজ প্রায় ২০ বছর পুর্বে শুরু হয়েছিল। লন্ডনের আদলে তৈরি এই প্রকল্প সমাপ্ত হতে প্রায় ১০ বছর সময় লেগেছিল।

জেনে অবাক হবেন যে, এখানের সবগুলো বাড়িই ডুপ্লেক্স! ভ্যালি সিটি এতোটাই পরিপাটি যে দেখে মনে হবে দেশের মাটিতে এক টুকরো বিদেশ। পূর্ব শাহী ইদ্গাহ ও টিবি গেইটের পাশে অবস্থিত এই শহর লন্ডনি পাড়া হিসেবেও পরিচিত। এখানে যতগুলো ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে তার মালিকগণ সবাই লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ২০১০ সালে ডঃ শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরি এই আধুনিক শহর নির্মাণের উদ্যেগ নেন। তার এই ব্যাতিক্রমধর্মী উদ্যেগে আরও অনেকেই যোগ দেন।

vally-city-flag-bangladesh.jpg

এক্সপার্ট আর্কিটেক্ট দিয়ে এই শহরের ডিজাইন বেশ নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল। মজার বিষয় হচ্ছে, এই এলাকার সব বাড়িই একটি স্পেসিফিক ডিজাইনে তৈরি করা হয়। আধুনিক জীবনের সকল সুযোগ সুবিধা রয়েছে এখানে।

ডুপ্লেক্স বাড়ি, মসজিদ, জিমনেশিয়াম, পার্ক এবং পরিপাটি রাস্তা দেখে যে কারোরই মন ছুঁয়ে যাবে। ডুপ্লেক্স বাড়ি আর বিদেশি ঘরণার রাস্তাঘাট দেখলেই নামকরণের সার্থকতা দেখতে পাওয়া যায়।

ভ্যালি সিটির আয়তন ২০০০ শতক। এখানে মোট ৬৯ টি বাড়ি রয়েছে, এবং সবগুলোই লন্ডনের বাড়ির আদলে ডুপ্লেক্স করে বানানো হয়েছে। আলো- বাতাস চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাঁকা জায়গা রয়েছে প্রতিটি বাড়ির মাঝে। ডুপ্লেক্স বাড়ির দোতালায় রয়েছে অ্যাটাচ বাথরুম সহ ৪ টি রুম, নিচ তালায় ড্রয়িং, ডাইনিং। রান্নাঘর এবং সার্ভেন্ট রুম অবস্থিত।বাড়ির সামনে ফুল, ফল এবং সবজি বাগান রয়েছে। বাড়ির মালিকগণ সারাবছর সবজি চাষ করে থাকেন। প্রতি রাস্তার মোড়ে আছে নম্বর প্লেট যাতে করে সহজে বাড়ি চেনা যায়।

এই শহরের ৫০ ভাগ বাড়ির মালিক লন্ডনে থাকেন। বাকি ৫০ ভাগ এখানে বসবাস করেন। বাড়ির দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিটি বাড়ির সামনে রয়েছে সিসি ক্যামেরা। এছাড়াও নিরাপত্তারক্ষীও রয়েছে। সকাল সন্ধ্যা বাচ্চাদের কোলাহলে মুখরিত এই লন্ডনী পাড়া।

কাজি ক্যাসল-Kazi castle

সবচেয়ে ব্যয়বহুল বাড়ি সিলেটের ‘কাজি ক্যাসল’ আলোচনার ঝড় তুলেছে। বাড়ির মালিক হচ্ছেন বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড আল-হারামাইন পারফিউমস্ গ্রুপ অব কোম্পানীজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাবুর রহমান। মাহতাবুর রহমান ২০১৩ ও ১৪ সালে বাংলাদেশে সর্বাধিক রেমিট্যান্স পাঠানোর স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। সিলেটের ইসলামপুর এলাকায় বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৮ সালে সিলেটের ইসলামপুর এলাকায় ৩ তালা বিশিষ্ট এই বাড়িটি নির্মাণএর কাজ শুরু হয়। প্রায় ৮ একর জায়গার উপর নির্মান করা হয়েছে বাড়িটি। বাড়ির কাজে নিয়োজিত করা হয় দুবাই, ফ্রান্স ও লেবানিজ ও জার্মান কোম্পানি।

বাড়ির ডিজাইন করেছেন দুবাইয়ের একজন আর্কিটেক্ট। ইন্টেরিয়র ডিজাইন করেছেন একজন লেবানিজ ইন্টেরিয়র ডিজাইনার।সিলিং এর টিফেনি লাইটিং এর কাজ একটি জার্মান কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছিল। ফ্লোরের কাজে একটি ফ্রেঞ্চ কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছিল। ২০০-৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। বিলাস বহুল ৮০ হাজার স্কয়ার ফিটের বাড়িটি তৈরী করতে ২৫০ শ্রমিকের ৮ বছর সময় লেগেছে। বাড়িটিতে হ্যালিপ্যাড, সুইমিং ও স্টীমবাথসহ অত্যাধুনিক এবং বিলাসবহুল সকল সুযোগ সুবিধা রয়েছে।

kazi-castle-sylhet-flag-bangladesh.jpg

৫ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই বাড়িটিতে হ্যালিপ্যাড, সুইমিং ও স্টীমবাথসহ অত্যাধুনিক এবং বিলাসবহুল সকল সুযোগ সুবিধা রয়েছে। অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ রয়েছে। ২৯টি মাস্টারবেড ২৯টি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে ডিজাইন করা হয়েছে।

ভবনের নিচতলায় রয়েছে ৯টি ডাইনিং রুম, ১৪টি ড্রয়িংরুম, ২টি লিফট। খেলাধুলার জন্য আছে ব্যাডমিন্টন কোর্ট, টেনিস কোর্ট। ব্যায়ামের জন্য জিম, সাঁতারের জন্য সুইমিং পুল, রিকরেশন এরিয়া, স্পা, কি নেই! আছে প্রাইভেট গার্ডেন, আউটডোর ডাইনিং এর ব্যবস্থা। ইতালিয়ান ঐতিহ্যবাহী ওয়ান প্লেট মার্বেলের আধিক্য দেখা যায় সারা বাড়ি জুড়ে।

সৌদি আরবের ওয়াকফ মিনিস্ট্রির উপহার দেয়া কাবা শরিফের দরজার রেপ্লিকা যেন ঘরের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুন। রাত হলেই বাড়ির রং পরিবর্তন হয়। একের পর এক রঙে দেখা যায় বাড়িটি। সরাসরি না দেখলে বোঝানো যাবে না এই বাড়ির সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য।

আপনার ভবিষ্যত প্রজন্মকে সবুজের ছায়াঘেরা পরিবেশে বেড়ে উঠতে কিংবা রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ছিমছাম ফ্ল্যাট খুঁজে পেতে অথবা আপনার বাড়ি বিক্রিতে সাহায্য করতে আপানার পাশে আছে ফ্লাগ বাংলাদেশ। এছাড়াও আপনার পুরোনো কিংবা নতুন ঘরকে রাঙ্গিয়ে তুলতে ফ্লাগ বাংলাদেশ (https://www.flagbangladesh.com) আপনার সাথে আছে সবসময়।